মৌলিক অবকাঠামো ও পরিবেশ আইনের ফাঁকে রাজশাহী নগরীর সংকট
ড: প্রকৌ: মো: জাকির হোসেন খান
রাজশাহী নগরী ঐতিহ্য, শিক্ষা ও পরিকল্পিত নগরায়নের জন্য একসময় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে এটি মৌলিক অবকাঠামো ঘাটতি ও পরিবেশগত সংকটের এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি।
বিদ্যমান সমস্যাগুলো শুধু নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নয়, বরং বাংলাদেশের প্রচলিত পরিবেশ আইন ও নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়নের ঘাটতিও স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নীতিমালা, ২০২৩ পরিবেশ সংরক্ষণে প্রধান আইনগত ভিত্তি প্রদান করে। পাশাপাশি জাতীয় পানি নীতি, ১৯৯৯, বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩, এবং বাংলাদেশ ভবন নির্মাণ আইন, ১৯৫২ নগর ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা। কিন্তু রাজশাহীর বর্তমান বাস্তবতা এসব আইনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ: আইনের বাইরে বাস্তবতা
একটি আধুনিক শহরের জন্য পৃথক স্যুয়ারেজ লাইন ও কেন্দ্রীয় পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার (এসটিপি)অপরিহার্য। কিন্তু রাজশাহীতে এ ধরনের অবকাঠামো এখনো অনুপস্থিত। ফলে অপরিশোধিত গৃহস্থালি বর্জ্য সরাসরি খোলা ড্রেনে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিবেশ সংরক্ষণ নীতিমালা, ২০২৩ অনুযায়ী, কোনো বর্জ্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ ছাড়া পরিবেশে নির্গমন করা আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়ম উপেক্ষিত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি (ডায়রিয়া, টাইফয়েড ইত্যাদি) বাড়াচ্ছে এবং নগর পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
শিল্প দূষণ ও বর্জ্য পরিশধন: আইন আছে, প্রয়োগ নেই
রাজশাহীর বিসিক শিল্পাঞ্চলে অনেক কারখানায় বর্জ্য জল পরিশোধন প্লান্ট (ইটিপি) থাকা বাধ্যতামূলক, যা বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী পরিবেশ ছাড়পত্র পাওয়ার শর্ত। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি খাল ও ড্রেনে ফেলে দিচ্ছে। এতে করে মাটি, পানি ও কৃষি জমি দূষিত হচ্ছে। এই অবস্থা প্রমাণ করে যে আইন থাকলেও তদারকি ও বাস্তবায়নের ঘাটতি প্রকট।
নগর তাপমাত্রা ও হিট আইল্যান্ড: পরিকল্পনার অভাব
রাজশাহী বর্তমানে তাপপ্রবাহ প্রবণ শহরগুলোর একটি। নগরায়নের ফলে গাছপালা কমে যাওয়া, অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণের কারণে হিট আইল্যান্ড প্রভাব তৈরি হচ্ছে। জাতীয় পরিবেশ নীতিমালা ২০১৮ এ নগর সবুজায়ন ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাস্তবে তা প্রতিফলিত হচ্ছে না। পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ, রুফ গার্ডেন ও সবুজ করিডোর তৈরির উদ্যোগ এখনো সীমিত।
পানি সরবরাহ ও মান নিয়ন্ত্রণ
জাতীয় পানি নীতি, ১৯৯৯ অনুযায়ী নাগরিকদের জন্য নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু রাজশাহীতে পানির চাপ, মান ও সরবরাহে বৈষম্য এখনও বিদ্যমান। পানির মান নিয়মিত পরীক্ষার অভাব জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটি বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩ এর উদ্দেশ্যের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
নির্মাণ কাজ ও বায়ু দূষণ
নির্মাণকাজের সময় ধুলা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা থাকা বাধ্যতামূলক, যা বাংলাদেশ ভবন নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্তে অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বাস্তবে খোলা অবস্থায় বালু ও নির্মাণ সামগ্রী রাখা, পানি না ছিটানো ইত্যাদি কারণে বায়ুদূষণ বাড়ছে, যা নগরবাসীর স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধি ২০২২ এ নির্মাণ কার্যক্রমের সময় বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে করণীয় বিভিন্ন কার্যকর ব্যবস্থা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে নগর পরিবেশের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব।
জলাশয় দখল: আইনের লঙ্ঘন
রাজশাহীর পুকুর, খাল ও জলাশয় দখল ও ভরাটের প্রবণতা উদ্বেগজনক। অথচ বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩ এবং জাতীয় পরিবেশ নীতিমালা ২০১৮ জলাশয় সংরক্ষণের ওপর জোর দেয়। আইন থাকা সত্ত্বেও জলাশয় রক্ষা না হওয়া প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিফলন।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: সবচেয়ে দুর্বল খাত
বর্তমানে রাজশাহীতে খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলা একটি সাধারণ চিত্র, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবেশগত মান বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। অথচ স্যানিটারি ল্যান্ডফিল, রিসাইক্লিং ও কম্পোস্টিং ব্যবস্থার অভাব আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।
বিদ্যুৎ অপচয় ও ইকোসিস্টেম
অপ্রয়োজনীয় ও ভুল লাইটিং ব্যবস্থার কারণে বিদ্যুৎ অপচয়ের পাশাপাশি নগরের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও এটি সরাসরি কোন নির্দিষ্ট আইনের আওতায় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত নয়, তবে জাতীয় পরিবেশ নীতিমালা ২০১৮ এর টেকসই শক্তি ব্যবহারের লক্ষ্য এর সাথে সাংঘর্ষিক।
সমাধানের পথ: আইন বাস্তবায়নই মূল চাবিকাঠি
রাজশাহীকে একটি টেকসই নগরীতে রূপান্তর করতে হলে নতুন আইন প্রণয়নের চেয়ে বিদ্যমান আইনগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন বেশি জরুরি। এজন্য প্রয়োজন-
• আধুনিক স্যুয়ারেজ ও এসটিপি স্থাপন • শিল্প কারখানায় বাধ্যতামূলক ইটিপি নিশ্চিত করা • জলাশয় সংরক্ষণে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ • বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা • নগর সবুজায়ন ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা • পরিবেশবান্ধব নির্মাণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা
রাজশাহীর বর্তমান সংকট আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, উন্নয়ন কি কেবল দৃশ্যমান অবকাঠামো, নাকি একটি বাসযোগ্য, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশসম্মত শহর গড়ে তোলার প্রক্রিয়া? যদি পরিবেশ আইন ও নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত না করা যায়, তবে উন্নয়ন অব্যাহত থাকলেও সেই শহর টেকসই বা বাসযোগ্য হবে না। এখন সময় এসেছে উন্নয়নের ধারণাকে পুনর্বিবেচনা করার, যেখানে পরিবেশ সুরক্ষা ও মৌলিক নাগরিক সেবাই হবে অগ্রাধিকার।
(লেখক সহকারী অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি, নাটোর।)
What's Your Reaction?

