ইত্তেফাক
- জেবুন নাহার
২৮/০৪/২০২৬
এখন থেকে আঠারো মাস আগে
তোমাকে কখন যেন প্রথম দেখেছিলাম
আজ আর ঠিক মত মনে নেই আমার।
ইট পাথরের বিশাল বিশাল অট্টালিকার ভিড়ে
ধুলি ধূসরিত শব্দমুখর যানজট ঠেলে ঠেলে
প্রতিদিন ক্ষয়ে যাওয়া জীবন থেকে
নিংড়ে নেয়া সময়গুলো
বিবর্ণ বিষাদে দূষণের কালো চাদরে
মুখ গুঁজে নিজেকে বিলীন করে উবে যায়
নিত্যদিন সাদা কর্পুরের দানার মতন।
ঘিঞ্জি বস্তি আর উপচে পড়া উচ্ছিষ্টের এ শহরে
নিত্যদিন সূর্য ডুবে যায় হতাশার মৃত সাগরে,
হঠাৎই অজানা আগন্তুকের ন্যায়
পশ্চিম আকাশে উঁকি দেয় সন্ধ্যা তারা
আত্ম বৈপরীত্যে ঠাসা এই ঢাকা শহরে
ভাবলেশহীন নির্মমতা
তার একান্ত অনৈচ্ছিক বন্ধনে
বেঁধে রাখে যেন গর্ভে প্রতিপালিত
লোকালয়গুলোকে।
প্রকৃতির অকৃত্রিম নির্মলালোকে
ধুয়ে যাওয়া চাঁদ আর বিধৌত জোৎস্নার হাসি যেন
ঢাকা পড়ে যায় কৃত্রিম আলোকসজ্জার
রঙ বেরঙ্গী ঝালরে ছাই চাপা আগুনের মতো।
বার, ক্যাফে, রেস্তোরাঁ আর শপিংমলগুলোতে
ঢলে পড়া সাঁঝের হাঁক চিৎকার আর
তাম্রবিষে বিষাক্ত বেপরোয়া অহংকারে
পুড়ে মরে কত শত একরোখা শিকার,
এ যেন সিসার আঁধারে হাতড়ে মরা নগরীর
একক দায়ভার।
দিন গুনে গুনে বছর গড়িয়ে আরো ছ'টি মাস
এভাবেই ব্যস্ত জীবনে শৃঙ্খলিত শ্রমের হিসাব নিকাশ
শেষে হালখাতায় লেখা কেবল হেরে যাওয়া উপন্যাস ।
রাতের গভীরে এ কৃত্রিম শহরে যখন
ঘুম চুমে যায় চোখের পাতা
অজানা অশরীরী নিহারিকার পানে চেয়ে
আমি খুলে বসি আমার রোজনামচার খাতা
অবাক করা বিস্ময়ে চেয়ে দেখি সেথায়
স্পষ্ট করে কিছুই লেখা নাই।
কেবল আঁকিবুকি, হিজিবিজি, কাটাকুটি
লাভ আর ক্ষতি সমানে সমানে বিকোয়
অপ্রচলিত চির প্রাচীন সেই একই মুদ্রায়।
কেবল, তোমার মুখখানি ভাসে আদরে উল্লাসে
ঘুমোতে দেয়না, জাগিয়ে রাখে, সপ্রভ উদ্ভাসে
দূরে গিয়ে ফের আমার কাছেই ফিরে ফিরে আসে।
সন্জীবিত উজ্জ্বল শুভ্রতা জড়ানো স্বপ্নময়তায়
স্বর্গীয় দ্যুতি ছড়িয়ে স্মিত হাসে,
আর ঠিক তখনই প্রজ্জ্বলিত শুকতারা যেন
অপেক্ষমান হয় আর একটি ভোরের প্রতীক্ষায়
নিকটবর্তী পশ্চিমাকাশে।
তোমার বোবা চাহনির নিরব ভাষা
ঠিক ঠাক পড়ে নিয়েছে তো
আমার খুব মনোযোগী দুটি চোখ? সে কি শুধায় -
এতদিন কোথায় ছিলে,
কেনই বা এলে, এ অবেলায়
জীবনের তৃতীয়া তিথির পরিপূর্ণ পানপাত্রে
ঠাঁইহীন একফোটা সুধার বিন্দু বর্ষনে,
আর সাংসারিক পার্থিব জগতের প্রতিষ্ঠিত
নিয়ম-রীতির বিরুদ্ধাচারিত ছন্দ পতনে?
কাটেনি কি দিন তোমার আমার
অগোচরিত ভিন্ন প্রবাহে সমান্তরাল?
যুদ্ধ-শান্তি, সংকট- ক্রান্তি
হয়েছে গত কত শত শত বিচ্ছিন্ন প্রহর
গ্রাম থেকে শহর, দেশ থেকে বিদেশ
কোথায় ছিলে, কোন সে প্রদেশ?
হয়নি তো দেখা, মোরা একা একা
কাটিয়েছি দিন নিজেদের মতো!
আপন খেয়ালে মনের দেয়ালে
লাগিয়েছি রঙ মনের মতন।
তুমি ছিলে কিনা পৃথিবীর পরে
আসেনি সে খেয়াল একবার তরে
কিভাবে বা আসে ছিলনা যে পাশে
তার থাকাতে কি বা যায় আসে?
তাকে হেসে বলি, জীবনের স্রোত বহমান হোক
আমি কে যে ভাঙ্গি, কে সে সংহারী
যে নিয়মনীতি জড়ায়ে ভূলোক!
যা আছে লেখা তাই হবে দেখা
অনন্ত অসীম রয়েছেন স্থির
ঘটিছে যা সব সিদ্ধান্তসম।
এসেছি যদিবা চলিয়াও যাব,
কেবলই হারিনি হারিয়েও যাব।
তবু তোমার আমার এই যে দেখা
প্রবাহিত সময়ের সমান্তরাল রেখা
আড়াআড়ি বপনে এই যে প্রচেষ্টা
প্রতি এক মিলিয়নে একবারই ঘটা
আজব ইত্তেফাক।
লিটিলউডের তত্ত্ব ছেড়ে
ফের তোমাতেই আসি আমি ফিরে
বিষাদ চিৎকারে কাঁপা কাঁপা স্বরে
তোমারে শুধায়: এর পর কি?
নিয়তির অকস্মাৎ বয়ে আনা ঝড়
অথবা প্রবঞ্চনার অনলে পোড়ানো
সজোরে বসানো কোন চড়
করবে তছনছ হাজার ফানুসে
সাজানো অলীক এ খেলাঘর।
এর পর কি আবার আগের মতোই অচেনা পাখি,
না তুমি আমায় দেখ, না আমি তোমায় দেখি?
এমন করেই আঠারটি মাস হয়েছে অতিক্রান্ত
তুমি যেন মোর তৃষ্ঞার্ত হৃদয়ে বাতিঘরসম
দিক প্রদর্শনে হৃদয়কে কর প্রশান্ত।
তুমি তো কেবল নিয়তির এক অমূল্য সংযোগ নও
এক বিমূর্ত ভালোবাসার অনুপ্রেরণা,
মূর্তিমান স্পর্শের তীব্র হাতছানিতে
সন্জীবিত কর, প্রজ্জ্বলিত কর, উদ্বেলিত কর নিরন্তর।
নব বৈশাখের খরতাপ ধুয়ে থমকে যাওয়া দমকা হাওয়ায়
বজ্রনিনাদে আছড়ে পড়া বর্ষাকাশে তাই
যোগ হয় আরো একটি রোজনামচা।
এঁকে চলেছি মনের ক্যানভাসে
জলরঙে রাঙিয়ে তুলির প্রতিটি আঁচড়ে
অধ্যাবসায় আর আনুরাগ মিশ্রিত আত্ম-নিমগ্নতায়
নিংড়ানো কল্পনার কঠিন সততায়
একের পর এক বলে চলা কথা আর বয়ে যাওয়া মুহুর্ত।
হয়ত এটি একটি অসম্পূর্ণ চিত্রকর্মই রয়ে যাবে
হয়ত কোনদিন দেখবেনা কেউ এর পরিপূর্ণতা
হয়ত, বিচ্ছেদের মুহূর্ত অত্যাসন্ন তবু
কে দেখেছে কবে দৃষ্টির আগে দৃশ্যের চয়ন?
তাই, আজ, হঠাৎ বরষায় মেঘাচ্ছন্ন আকাশের ঠান্ডা বুকে
একে দিলাম কয়েকটি পলের স্পর্শ উত্তাপ
হয়ত, এটিই জীবনের শেষ আর্ত চিৎকার
অথবা, শেষ আত্মরক্ষা
অথবা, হতে পারে এটি-
কেবলই এক আজব ইত্তেফাক।
What's Your Reaction?

