পদ্মা ব্যারেজ: ভবিষ্যৎপরিবেশগত প্রভাব নিয়ে নতুন উদ্বেগ

Jun 10, 2026 - 16:56
 0  18
পদ্মা ব্যারেজ: ভবিষ্যৎপরিবেশগত প্রভাব নিয়ে নতুন উদ্বেগ
Photo: AI/Correspondent/Author

ডঃ প্রকৌ: মোঃ জাকির হোসেন খান 

দীর্ঘদিনের আলোচনা ও বিতর্কের পর বাংলাদেশের প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প এখন বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। সাম্প্রতিক সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যারেজটি পদ্মা নদীর উপর রাজশাহী জেলার পাংশা অঞ্চলের কাছে নির্মাণ করা হতে পারে। সমর্থকদের মতে, এই প্রকল্প দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সমালোচক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হলে এর প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে নদীভাঙন বৃদ্ধি, নতুন চর জেগে ওঠা, নাব্যতা হ্রাস এবং অস্বাভাবিক বন্যার মতো ঝুঁকি ভবিষ্যতে আরও তীব্র হতে পারে

বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যারেজটি পাংশা এলাকায় নির্মাণের পেছনে প্রধান কারণ হলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ বাড়ানো। এর মাধ্যমে গোড়াই নদী, মধুমতি নদী, মাথাভাঙ্গা নদী সহ বিভিন্ন সংযুক্ত নদীতে পানি সরবরাহ উন্নত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে

ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে, বাংলাদেশ সীমান্তের নিকটে অবস্থিত। প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজটি ফারাক্কা থেকে সরলরেখায় আনুমানিক ১২০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে হতে পারে, যদিও নদীপথে দূরত্ব আরও বেশি। ফলে পদ্মা ব্যারেজের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে ফারাক্কার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করা পানির পরিমাণের ওপর

বিভিন্ন প্রকৌশল ও প্রযুক্তিগত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ব্যারেজটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২.১ কিলোমিটার হতে পারে। এতে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার-স্লুইস গেট, নৌযান চলাচলের জন্য নেভিগেশন লক, মাছের চলাচল রক্ষায় ফিশ প্যাসেজ এবং প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। তুলনামূলকভাবে, ফারাক্কা ব্যারেজ এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২.২৪ কিলোমিটার এবং এতে প্রায় ১০৯টি গেট রয়েছে

ফারাক্কার মতোই প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। এখানেই প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় পরিবেশগত উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, যদি শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না পাওয়া যায়, তাহলে কী হবে? অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এটিই প্রকল্পটির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ দিক। যদি ফারাক্কার পর বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পানি প্রবেশ না করে, তাহলে পদ্মা ব্যারেজ কার্যকর নদী ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে আংশিক পূর্ণ জলাধারে পরিণত হতে পারে। এর ফলে ভাটির অঞ্চলে বিভিন্ন গুরুতর পরিবেশগত সমস্যা দেখা দিতে পারে

১. দ্রুত নাব্যতা সংকট

পদ্মা নদী পৃথিবীর অন্যতম পলিবাহী নদী হিসেবে পরিচিত। পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ না থাকলে নদী তার স্বাভাবিক পলি বহন ক্ষমতা হারাতে পারে। ফলে ব্যারেজের উজানে ব্যাপক পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাবে, গভীরতা কমে যাবে এবং দ্রুত নাব্যতা সংকট তৈরি হবে। বিশেষ করে রাজশাহী, পাবনা ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে নতুন চর গঠনের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে

২. নদীভাঙনেরতীব্রতা বৃদ্ধি

নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করলে এর প্রাকৃতিক জলগত ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। কোথাও অতিরিক্ত স্রোত, কোথাও স্থির পানি এবং কোথাও ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি হতে পারে। এই অনিয়মিত প্রবাহ নদী ভাঙনকে আরও অনির্দেশ্য ও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। বর্তমানে মাঝারি ভাঙন ঝুঁকিতে থাকা রাজশাহী অঞ্চলের অনেক এলাকা ভবিষ্যতে বড় ধরনের নদী ভাঙনের মুখোমুখি হতে পারে

৩. রাজশাহী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি

ব্যারেজের উজানে অতিরিক্ত পলি জমলে নদীর গভীরতা কমে যাবে এবং বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পাবে। এর ফলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত আশপাশের নিম্নাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। রাজশাহী শহর, গোদাগাড়ী, চারঘাট এবংপাবনার কিছু অংশ ভবিষ্যতে আকস্মিক ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। নদীর তলদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে উঁচু হয়ে গেলে সামান্য অতিরিক্ত বর্ষণও বড় ধরনের বন্যা সৃষ্টি করতে পারে

৪. উজান অঞ্চলের পরিবেশগত অবনতি

ব্যারেজের আগে পানির গতি সাধারণত কমে যায়, যা পলি জমা ও চর গঠনের হার বাড়ায়। এর ফলে নদী প্রশস্ত হলেও অগভীর হয়ে যেতে পারে। মাছের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, নৌপরিবহন ব্যাহত হতে পারে এবং শুষ্ক মৌসুমে নদীর বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। পর্যাপ্ত সারা বছরের প্রবাহ না থাকলে পদ্মার উজান অঞ্চলের পরিবেশ আরও জটিল ও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে

৫. জীববৈচিত্র্যের ওপর গুরুতর প্রভাব

পদ্মা নদীএর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে গেলে এর জীববৈচিত্র্যের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। ইলিশসহ পরিযায়ী মাছের চলাচল ও প্রজনন ব্যাহত হতে পারে, প্রাকৃতিক ডিম ছাড়ার ক্ষেত্র নষ্ট হতে পারে এবং নদীর ডলফিনসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাস পরিবর্তিত হতে পারে। অতিরিক্ত পলি জমে পানির অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় পানির গুণগত মানও অবনতি ঘটতে পারে। গোড়াই নদীও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যান্য নদীতে ফারাক্কার পর যে পরিবেশগত পরিবর্তন দেখা গেছে, তেমন পরিস্থিতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোতেও তৈরি হতে পারে

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে নির্ধারিত পরিমাণ পানি পাওয়ার অধিকার রাখে। কিন্তু বাস্তবে বহু সময় পানি প্রবাহ প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কমে যায়। পদ্মা নদী নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, গত এক দশকে হার্ডিং ব্রিজ পয়েন্টে গড় প্রবাহ ছিল প্রায় ৫,২৫৩ কিউমেক, বর্ষাকালে সর্বোচ্চ গড় প্রবাহ ছিল প্রায় ৪৬,৮৯৯ কিউমেক এবং সর্বনিম্ন গড় প্রবাহ নেমে আসে মাত্র ৮৯০ কিউমেকে। এই নিম্ন প্রবাহ পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক

বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের উচিত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ দলিলে এ স্বাক্ষর করা। আন্তর্জাতিক পানি আইন অনুযায়ী, কোন দেশ একতরফাভাবে আন্তঃসীমান্ত নদীর প্রবাহ বন্ধ বা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করতে পারে না। কারণ এতে ভাটির দেশের ওপর গুরুতর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব পড়তে পারে। এই আন্তর্জাতিক আইনে নদীর পানি ব্যবহারে ন্যায্যতা ও যৌক্তিকতার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে ভৌগোলিক অবস্থা, জলবিজ্ঞান, জলবায়ু, জনসংখ্যার চাহিদা এবং অন্য দেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করতে হয়। কোনো দেশ এক তরফাভাবে নদীর প্রবাহ বন্ধ করলে তা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে এবং এর ফলে কূটনৈতিক বিরোধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে

সামগ্রিকভাবে, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে পরিণত হতে পারে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নির্ভর করবে পর্যাপ্ত শুষ্ক মৌসুমের পানি, কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বৈজ্ঞানিক নদী ব্যবস্থাপনার ওপর। অন্যথায়, এটি ভবিষ্যতে বৃহৎচরগঠন, ভয়াবহ নদী ভাঙন, নাব্যতা সংকট, অস্বাভাবিক বন্যা এবং জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস আরও ত্বরান্বিত করতে পারে

ফারাক্কা ব্যারেজ এর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করতে হয়। প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা ভবিষ্যতে নিয়মিতভাবে নিশ্চিত হবে কিনা, সেই প্রশ্ন এখনো বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে

(লেখক সহকারী অধ্যাপকপুরকৌশল বিভাগবাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজিনাটোর।)

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

News Desk Chief Editor, Our Voice Online