জনবল ও অর্থ সংকটে অচল নৌ অ্যাম্বুলেন্স, বঞ্চিত চরের মানুষ
মুসা মিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
পদ্মা নদীর চরাঞ্চলের মানুষের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চালু করা হয়েছিল নৌ অ্যাম্বুলেন্স। দূর-দূরান্তের দুর্গম চর এলাকা থেকে রোগীদের দ্রুত শহরে এনে চিকিৎসা দেওয়ার লক্ষ্যেই ছিল এই উদ্যোগ। কিন্তু প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল ও অর্থ সংকটের কারণে বর্তমানে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে।
জরুরি মুহূর্তে সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চরাঞ্চলের অসহায় মানুষ। গুরুতর রোগীদের হাসপাতালে নিতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে চরাঞ্চলের মানুষের জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য চালু করা নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি এখন অযত্ন-অবহেলায় কার্যত অচল। খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে এটি। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সংস্কার করে পুনরায় চালু করা হোক সেবাটি।
জানা গেছে, ২০২০ সালের ২৫ আগস্ট তৎকালীন সংসদ সদস্য সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল আনুষ্ঠানিকভাবে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটির উদ্বোধন করেন। উপজেলার উন্নয়ন তহবিল থেকে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয় আসনের এই বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্সটি পাঁকা ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবার কথা বিবেচনা করে চালু করা হয়। পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদকে।
উদ্বোধনের পর প্রথম দিকে কয়েক মাস নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি চলাচল করলেও ধীরে ধীরে এর কার্যক্রম কমে আসে। ২০২২ সালের পর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এর চলাচল। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের পাশেই খোলা জায়গায় অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে এটি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পড়ে থাকা নৌ অ্যাম্বুলেন্সটিতে শিশুদের খেলতে দেখা যায়। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর কাঠামো ও যন্ত্রাংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় মাদকসেবী ও অসাধু ব্যক্তিরা সাইরেন, সিট, নাট-বল্টুসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে গেছে। ফলে এটি এখন সম্পূর্ণ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
চরাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় জরুরি সময়ে রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে প্রসূতি মা, বৃদ্ধ ও গুরুতর রোগীদের জন্য পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও ভয়াবহ। অনেক সময় নদীপথ পাড়ি দিতে গিয়ে রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের মতে, নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি সচল থাকলে বহু মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো।
এমনিতেই চরাঞ্চলের মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। নদীভাঙন, দারিদ্র্য ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা তাদের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত এসব মানুষের জন্য নৌ অ্যাম্বুলেন্স ছিল একমাত্র ভরসা। অথচ সেই সেবাটিই আজ অবহেলায় ধ্বংসের মুখে।
পাঁকা ইউনিয়নের বাসিন্দা শহিদুজ্জামান বলেন, “অ্যাম্বুলেন্সটি চালুর পর ছয়-সাত মাস ভালোই চলেছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই এটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর কখনো পানিতে নামানো হয়নি। প্রায় চার বছর ধরে এটি এভাবেই পড়ে আছে।”
দশরশিয়া গ্রামের শামীম রেজা বলেন, “এটি মূলত রোগীদের ব্যবহারের জন্য চালু করা হলেও বাস্তবে তেমন কাজে লাগানো হয়নি। কিছুদিন ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের পর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে এটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।”
পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আব্দুল আহাদ জানান, “প্রাথমিকভাবে কিছুদিন নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি চালু ছিল। কিন্তু জ্বালানি খরচ বেশি হওয়া এবং পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় এটি নিয়মিত চালানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন খোলা জায়গায় পড়ে থাকায় এর অবস্থা এখন খুবই খারাপ। মেরামতে আনুমানিক দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা প্রয়োজন হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “চুরি হয়ে যাওয়া যন্ত্রাংশের কারণে এটি বর্তমানে সম্পূর্ণ অচল। পুনরায় চালুর বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। পরিচালনার জন্যও কোনো আর্থিক বরাদ্দ নেই। চরাঞ্চলের মানুষের পক্ষে জ্বালানি খরচ বহন করাও কঠিন।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি সংস্কার ও পুনরায় চালু করা হোক। কারণ, একটি সচল নৌ অ্যাম্বুলেন্স শুধু একটি যান নয়—এটি চরাঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবন বাঁচানোর শেষ ভরসা।
জেলা সিভিল সার্জন এ কে এম শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আমার কাছে নেই। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে খোঁজ নিতে বলা হয়েছে।’ আগামীতে চরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নৌ অ্যাম্বুলেন্সগুলোর কার্যকারিতা বজায় রাখার বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
What's Your Reaction?

