সাম্য, শান্তি ও মানবতার বার্তা মৌসুমী ভৌমিকের সংগীত সন্ধ্যায়
ডঃ আব্দুল হাই
মা, মতৃভূমি, দেশ, প্রবাস, ভিন্নতা, বহুমাত্রিক সমাজ, শান্তি ও মানবতার বিষয়গুলো ঘুরে ফিরে তাঁর দার্শনিক আলোচনায় স্থান পেয়েছে। পরিবার থেকে শুরু করে বিশ্বসমাজ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সেই আদিকাল থেকে চলে আসা সাম্য-অসাম্য আর ভাল-খারাপের দ্বন্দ্ব-সংঘাত ঘিরে রেখেছে তাঁর সুর, সঙ্গীত আর চিন্তাধারা। মানবিকতা আর মনুষ্য ধর্মের গুণকীর্তন ছড়িয়ে দিতেই যেন তাঁর সকল সাধনা। সেই সাধনার ব্যতিক্রম হয়নি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট নগরীর একক মৌসুমী সন্ধ্যায়।
শনিবার সন্ধ্যায় নগর জীবনের ব্যস্ততা লগ্নে গালুস মিলনায়তনে উপস্থিত হন বাংলা ভাষাভাষী দুই বাংলার প্রবাসীরা। দেশ বাংলা স্কুল তথা দেশ সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে সীমানাহীন ও স্বাধীনচেতা জনপ্রিয় মরমিশিল্পী মৌসুমী ভৌমিক এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রেমী প্রবাসীদের মধ্যে মিলনসূত্র সৃষ্টি করেন কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব মাকসুদুল আলম অপু, মিঠু কবির, শান্তা রায় এবং ঝন্টু আহমেদ।
বিজ্ঞানের আধুনিক ছোঁয়ায় কান ফাটানো হাজারো যন্ত্রের কোন সমারোহ ছিল না। ছিল না চোখ ধাঁধানো বাহারি আলোর ঝলকানি কিংবা রকমারি সাজে সজ্জিত তারকার পোশাক-আশাক। যেন খুব সাদামাটা গ্রামের মেয়েটি মাত্র একজন গিটার বাদক আর একটি মাত্র মাইক্রোফোন নিয়ে প্রচার করে চলেছেন বিশ্ব শান্তির মহামন্ত্র। ধরণীর আনাচে কানাচে চলমান যুদ্ধপীড়িত মানবতার আর্তনাদ বিশ্বমানবের কর্ণকুহরে পৌঁছে দিতে শব্দ আর সুরের জাল বুনছেন খুব শান্তভাবে। আদিকাল থেকে শুরু করে তথাকথিত আধুনিক সভ্য দুনিয়ার ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক প্রেক্ষাপটের নানা গল্পের সুতোয় তিনি উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের স্মরণ করিয়ে দেন যুগে যুগে ভেসে আসা সহমর্মিতা আর সহানুভূতির অমর বাণী।
কারবালা থেকে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, সাতচল্লিশের দেশভাগ, একাত্তরের রক্তগঙ্গা কিংবা তরুণ প্রজন্মের অধিকারের লড়াই কোন কিছুই বাদ যায়নি তাঁর দর্শন তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং স্বপ্নচারী শব্দবুননে। গোটা হল রুমে পিনপতন নীরবতা। অনেকের মাঝেই গানের সুর শোনার প্রবল তাড়না। কিন্তু না শুধু যন্ত্রসঙ্গীত আর সুরেলা গান নয় – বরং তার চেয়েও বেশি কিছু ভেসে আসে অতীব স্নিগ্ধতার সাথে ধীর লয়ে তাঁর জীবনের ও সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে সুদূর অতীতের ঘটনা প্রবাহ মহান পিতৃপুরুষদের রেখে যাওয়া সাম্য ও শান্তির গল্প। আর সেসব গল্পের সাথে তাল মিলিয়ে ছোট ছোট স্তবক কিংবা সুমধুর স্বপ্ন দেখা আর স্বপ্ন বোনার শব্দের মালা। কখনও সামান্য গিটারের তালে কিংবা আবার পুরোপুরি খালি গলায় উপহার দিলেন আলোড়ন তোলা গানের ডালি।
মৌসুমী ভৌমিকের চয়ন করা প্রতিটি শব্দই কঠিন ইঙ্গিতবহ। খুব সাদা চোখে সেসব শব্দের সরল অনুবাদ কিংবা ব্যাখ্যা হয়তো কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। চমৎকারভাবে প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের নিজের অনুভব এবং ধারা ফুটিয়ে তোলেন ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধনে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সবাই তলিয়ে যায় স্বপ্নিল অনাবিল শান্তিময় মুহূর্তে। আর তখনই সময় গড়িয়ে এক অনাকাঙ্ক্ষিত সমাপ্তিতে পৌঁছে মৌসুমী সন্ধ্যা, যখন শিল্পী নিজেই তাঁর বিখ্যাত একাকীত্বের মরমি কথাগুলো সবাইকে নিয়ে গাইতে থাকেন এবং উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের কণ্ঠে ধ্বনিত সুর-শব্দ নিজের মুঠোফোনে ধারণ করেন এক পরম আনন্দে।
What's Your Reaction?

