বিদ্যুৎ সংকটের বাংলাদেশে টেকসই নগর পরিবহনের ভাবনা
ড: প্রকৌ: মো: জাকির হোসেন খান
বাংলাদেশের নগর পরিবহন ব্যবস্থায় Electric Three-Wheelers (E3Ws) বা বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান এখন আর বিকল্প কোনো পরিবহন নয়; বরং লাখো মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষ করে রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াত, কম ভাড়া, সহজলভ্যতা এবং কর্মসংস্থানের কারণে E3Wsএর ওপর মানুষের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে যানজট, সড়ক নিরাপত্তা, শব্দদূষণ, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদা।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় যাত্রী, চালক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত, মাঠ পর্যবেক্ষণ, শব্দমাত্রা পরিমাপ এবং পরিবেশগত মূল্যায়নের মাধ্যমে E3Ws এর নগর পরিবহনে ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় রেলগেট, লক্ষ্মীপুর, তালাইমারী ও জিরোপয়েন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক করিডোর অন্তর্ভুক্ত ছিল। গবেষণার ফলাফল বলছে, E3Ws নগরবাসীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি উত্তরদাতা নিয়মিত E3Ws ব্যবহার করেন এবং ৭৩.৬ শতাংশ যাত্রী তাদের যাতায়াতকে আরামদায়ক বলে জানিয়েছেন। অর্থাৎ, গণপরিবহনের ঘাটতি পূরণে এবং স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে E3Ws-এর বাস্তব অবদান রয়েছে। একই সঙ্গে এই খাত হাজার হাজার চালক, মেকানিক, ব্যাটারি ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
কিন্তু সমস্যাও কম নয়। গবেষণায় ৬২.৮ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেছেন E3Ws যানজটের অন্যতম কারণ। অর্ধেকের বেশি উত্তরদাতা কোনো না কোনোভাবে সড়ক দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ৮৫.৬ শতাংশ উত্তরদাতা চালকদের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা উল্লেখ করেছেন। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অনিয়ন্ত্রিত লেন পরিবর্তন, যেখানে-সেখানে থামা, অপরিকল্পিত পার্কিং এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
শব্দদূষণও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। E3Ws-এর বৈদ্যুতিক মোটর তুলনামূলকভাবে কম শব্দ সৃষ্টি করলেও অতিরিক্ত হর্ন ব্যবহারের কারণে ব্যস্ত সড়কে শব্দমাত্রা প্রায়ই গ্রহণযোগ্য সীমা অতিক্রম করছে। ফলে বৈদ্যুতিক যান মানেই পরিবেশবান্ধব, এমন সরল ধারণা যথেষ্ট নয়। একটি যানবাহনের প্রকৃত পরিবেশগত প্রভাব নির্ভর করে তার বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসছে, কী ধরনের ব্যাটারি ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ব্যাটারি কীভাবে পুনর্ব্যবহার বা নিষ্পত্তি করা হচ্ছে এসব বিষয়ের ওপরও।
এখানে বর্তমান বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকট নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। আগস্ট ২০২৬ এ গ্যাস সরবরাহের সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি কয়েক হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে; কোনো কোনো এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হচ্ছে। ১৩ আগস্ট দেশের গ্যাস সরবরাহ দৈনিক চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এই বাস্তবতায় E3Wsএর বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা প্রয়োজন। তবে বিদ্যুৎ সংকটের জন্য E3Wsকে এককভাবে দায়ী করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক হবে না। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে E3Wsএর চার্জিং চাহিদা যথেষ্ট বড় হতে পারে এবং অনিয়ন্ত্রিত সময়ে চার্জিং জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে প্রায় ৫ লাখ E3Wsএর দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় ৪,৬৬০ MWh হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।
তাই সমাধান E3Ws বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং স্মার্ট চার্জিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সময় ও উৎস নিয়ন্ত্রণ করা। দিনের বা সন্ধ্যার পিক আওয়ারে চার্জিং সীমিত করে অফ-পিক সময়ে চার্জিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অফ-পিক সময়ে চার্জিং এবং টাইমার-নিয়ন্ত্রিত চার্জিং স্টেশন করা যেতে পারে।
আরও একটি বড় সম্ভাবনা হলো সৌর বিদ্যুৎ। বাংলাদেশে সৌর শক্তির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। নির্দিষ্ট E3W চার্জিং স্টেশনে ছাদের ওপর সোলার প্যানেল ব্যবস্থা, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং গ্রিড কানেকশন সমন্বয় করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো সম্ভব। ভবিষ্যতের E3W নীতিতে তাই শুধু যানবাহন নয়, E3Ws, চার্জিং স্টেশন, সৌরশক্তি, গ্রিডএই পুরো ব্যবস্থাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
ব্যাটারি ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ব্যবহৃত অনেক E3Wতে সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। পুরোনো ব্যাটারি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভাঙা, গলানো বা ফেলে দেওয়া হলে মাটি, পানি ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই প্রতিটি ব্যাটারির জন্য সংগ্রহ, পরিবহন, পুনর্ব্যবহার এবং নিরাপদ নিষ্পত্তির একটি ক্লোজড-লুপ ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম প্রয়োজন।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হওয়া উচিত, “নিষেধাজ্ঞা” থেকে “নিয়ন্ত্রণ ও একীভূতকরণে” যাওয়া। E3Ws পুরোপুরি বন্ধ করলে সস্তা পরিবহন সুবিধা হারাবেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ এবং কর্মসংস্থান হারাবেন বিপুল সংখ্যক চালক। অন্যদিকে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই এর বিস্তার ঘটতে দিলে যানজট, দুর্ঘটনা, শব্দদূষণ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে।
তাই প্রয়োজন নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং, নির্ধারিত রুট, নির্দিষ্ট স্টপেজ ও পার্কিং এলাকা, চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত মোটরযানের উপযুক্ততা পরীক্ষা, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ। পাশাপাশি অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন, অফ-পিক চার্জিং, সৌরবিদ্যুৎ ভিত্তিক চার্জিং এবং ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ঢাকায় ইতোমধ্যে E3W চার্জিং অবকাঠামোর বড় একটি অংশ অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে ওঠার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, যা জাতীয় পর্যায়ে পরিকল্পিত চার্জিং নেটওয়ার্কের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করে।
রাজশাহী এক্ষেত্রে একটি মডেল সিটি হতে পারে। শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় E3W রুট নির্ধারণ, স্মার্ট চার্জিং স্টেশন স্থাপন, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার, নির্দিষ্ট পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামার স্থান এবং ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে একই সঙ্গে যানজট, বিদ্যুৎ ব্যবহার, দুর্ঘটনা ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
মূল কথা হলো, E3Ws বাংলাদেশের নগর পরিবহনের সমস্যা নয়; অপরিকল্পিত E3W ব্যবস্থাপনাই সমস্যা। বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে, কোনো বৈদ্যুতিক পরিবহন ব্যবস্থাকে টেকসই করতে শুধু জ্বালানি হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেই হবে না; সেই বিদ্যুৎ কীভাবে উৎপাদিত, বিতরণ ও ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের পথ তাই স্পষ্ট: নিরাপদ E3W, নিয়ন্ত্রিত চার্জিং, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, দায়িত্বশীল ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী নগর পরিবহন প্রশাসন। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবভিত্তিক নীতির মাধ্যমে E3Ws একই সঙ্গে সাশ্রয়ী পরিবহন, কর্মসংস্থান এবং পরিবেশবান্ধব নগর চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
(লেখক সহকারী অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি, নাটোর।)
What's Your Reaction?

